home

call

email

প্রকাশকের নিবেদন

بسم الله الرحمن الرحيم

আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা কুয়েতের প্রখ্যাত সালাফী বিদ্বান আব্দুর রহমান বিন আব্দুল খালেক (জন্ম : ১৯৩৯ খৃ.) রচিত مشروعية العمل الجماعى-এর বঙ্গানুবাদ ‘শরী‘আতের আলোকে জামা‘আতবদ্ধ প্রচেষ্টা’ পুস্তিকাটি সম্মানিত পাঠকবৃন্দের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হলাম। ফালিল্লাহিল হাম্দ। ইতিপূর্বে মাসিক ‘আত-তাহরীক’-এ ধারাবাহিকভাবে ৩ কিস্তিতে (ডিসেম্বর’১৮-ফেব্রুয়ারী’১৯) পুস্তিকাটির বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত  হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত মূল্যবান এ পুস্তিকাটিতে সম্মানিত লেখক জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপন তথা সাংগঠনিকভাবে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি সাবলীলভাবে দলীল-প্রমাণসহ আলোচনা করেছেন।

ভূমিকা বাদে এতে মোট ৭টি অধ্যায় রয়েছে। ১ম অধ্যায় সম্মানিত লেখক জামা‘আত বা সংগঠনের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। জামা‘আত বা সংগঠনের একজন আমীর থাকার স্বতঃসিদ্ধ বিষয়টিও তিনি এখানে আলোচনা করেছেন। ২য় অধ্যায়ে শরী‘আতের আলোকে সাংগঠনিক প্রচেষ্টা, ৩য় অধ্যায়ে শাসক বা নেতার দায়িত্ব-কর্তব্য এবং ৪র্থ অধ্যায়ে ফরযে কিফায়াহ সম্পাদনে শাসক ও জনগণ উভয়ের দায়বদ্ধতার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। ৫ম অধ্যায়ে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে শারঈ বিধান প্রয়োগবিধির কথা আলোচনা করা হয়েছে। ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে ইসলামী বিশ্বে দাওয়াতী সংস্থা ও সংগঠন সমূহের অবদান আলোচিত হয়েছে। এতে বর্তমানে মানুষের কাছে দ্বীনের সঠিক দাওয়াত প্রচারে ও মুসলিম নবজাগরণে ইসলামী সংগঠন সমূহের অবদান যে অনস্বীকার্য তা অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। ৭ম অধ্যায়ে সংগঠন করা হারাম মর্মে ফৎওয়া প্রদানকারীদের ভ্রান্তি ও কূপমন্ডকতা সুস্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এধরনের ফৎওয়া প্রদানের কারণ সমূহ অত্যন্ত সুন্দরভাবে এ অধ্যায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। পুস্তিকাটির শেষ দু’টি অধ্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ।

মুসলিম উম্মাহকে সর্বদা জামা‘আতবদ্ধ হয়ে সুশৃংখল জীবন যাপন করার নির্দেশ দান করা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন জনতা একটি বিশেষ লক্ষ্যে একজন নেতার অধীনে সংঘবদ্ধ হ’লেই তাকে ‘জামা‘আত’ বলে। জামা‘আত গঠনের প্রধান শর্ত হ’ল নেতৃত্ব ও আনুগত্য। মসজিদ ভর্তি মুছল্লী থাকলেও যদি ইমাম না থাকে, তাকে যেমন জামা‘আত বলা হয় না। তেমনি মুক্তাদীবিহীন ইমামকেও ‘ইমাম’ বলা হয় না। সেকারণ তিনজনে একটি সফরে বের হ’লেও সেখানে একজনকে ‘আমীর’ নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জামা‘আতে ছালাত হ’ল জামা‘আতবদ্ধ জীবনের দৈনন্দিন প্রশিক্ষণের অংশ। জামা‘আত চলা অবস্থায় ইমামের আনুগত্য না করলে যেমন মুক্তাদীর ছালাত কবুল হয় না, জামা‘আতবদ্ধ জীবনে আমীরের আনুগত্য না করলে হাদীছের ভাষায় তার মৃত্যু হয় জাহেলিয়াতের মৃত্যু তথা বিশৃংখলিত অবস্থায় মৃত্যু। জামা‘আতবদ্ধ জীবন মানুষের স্বভাব ধর্মের অংশ। একে অস্বীকার করা চিরন্তন সত্যকে অস্বীকার করার ন্যায়। মোটকথা আমীর মুসলিম সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আমীর ব্যতীত সঠিক ইসলামী সমাজ কায়েম হওয়া অকল্পনীয়। যে জামা‘আত বা জনগোষ্ঠীর আমীর নেই সেই জামা‘আতের উদাহরণ হ’ল ঐ লাশের মতো যার মাথা নেই। মাথা ছাড়া দেহ যেমন অচল, আমীর বিহীন জামা‘আতও তেমনি অকার্যকর।

সুতরাং একবিংশ শতাব্দীর নব্য জাহেলী যুগে মুসলমানদের টিকে থাকতে হ’লে মুসলিম উম্মাহকে সকল প্রকার ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের নিঃশর্ত অনুসরণের মাধ্যমে জামা‘আতবদ্ধ জীবন যাপন করতে হবে। ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম থাক বা না থাক মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে সর্বাবস্থায় জামা‘আত ও ‘আমীর’ থাকা যরূরী। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَ ‘তোমাদের উপর জামা‘আতবদ্ধ জীবন অপরিহার্য করা হ’ল এবং বিচ্ছিন্ন জীবন নিষিদ্ধ করা হ’ল’ (তিরমিযী হা/২১৬৫)। তিনি বলেন, الْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ ‘জামা‘আতবদ্ধ জীবন হ’ল রহমত এবং বিচ্ছিন্ন জীবন হ’ল আযাব’ (ছহীহাহ হা/৬৬৭)

অথচ বর্তমানে কিছু ব্যক্তি সংগঠন করা হারাম মর্মে ফৎওয়া দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন। এ ধরনের ফৎওয়া প্রদান নিছক আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা ও ঝুঁকি থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করার মানসিকতা বৈ কিছুই নয়। অথচ ভীরু ও কাপুরুষকে দিয়ে কখনো দ্বীন কায়েম হয় না। তারা আরো যুক্তি দেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর যুগে সংগঠন ছিল না। অতএব তা বিদ‘আত। এরূপ ধারণা কূপমন্ডকতা ছাড়া কিছুই নয়। এ জাতীয় ফৎওয়া উদ্ভাবনের কারণ সমূহের মধ্যে একটি হ’ল জামা‘আতে ‘আম্মাহ ও জামা‘আতে খাছ্ছাহ-এর মধ্যে পার্থক্য না করা। মূলতঃ জামা‘আত দুই প্রকার। ১. ‘জামা‘আতে আম্মাহ’ বা ব্যাপকভিত্তিক সংগঠন। রাষ্ট্রীয় সংগঠন এই পর্যায়ে পড়ে। এই সংগঠনের আমীর হবেন আমীরুল মুমিনীন, যিনি ইসলামী বিধান মতে প্রজাপালন করবেন ও শারঈ হুদূদ কায়েম করবেন। এই ইমারতকে ‘ইমারতে মুলকী’ বা রাষ্ট্রীয় ইমারত বলা হয়ে থাকে। অমুসলিম দেশে এই ‘ইমারত’ কায়েম করা প্রায় অসম্ভব। ২. ‘জামা‘আতে খাছ্ছাহ্’ বা বিশেষ সংগঠন। দ্বীনের প্রচার ও প্রসার এবং দ্বীনদারদেরকে সংগঠিত করার জন্য কোন স্থানে তিনজন মুমিন থাকলেও তাদেরকে নিয়ে এই ধরনের জামা‘আত গঠন করা অপরিহার্য। এই জামা‘আত যত বড় হয়, তত ভাল। রাষ্ট্রের পক্ষে খুছূছী দাওয়াত প্রায় অসম্ভব। এর পরেও বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র যেখানে অনৈসলামী বিধান মতে শাসিত হচ্ছে এবং কোটি কোটি মুসলমান অমুসলিম দেশে বাস করছেন, সেখানে বিশেষ জামা‘আতগুলির নিরন্তর দাওয়াত ও সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমেই ‘দ্বীন’ জনগণের মাঝে টিকে আছে বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না। বিশেষ জামা‘আতের ‘আমীর’ শারঈ হুদূদ কায়েম করবেন না। কিন্তু তিনি অবশ্যই শারঈ অনুশাসন কায়েম করবেন এবং স্বীয় মামূরকে সর্বদা দ্বীনের পথে ধরে রাখতে প্রচেষ্টা চালাবেন।

সংগঠন বিরোধীরা যুক্তি দেখান যে, সংগঠন করলে পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। অথচ এটি একটি খোঁড়া যুক্তি। হিংসা-বিদ্বেষ সর্বত্রই নিন্দনীয় ও পরিত্যাজ্য। তা সংগঠনে হোক আর ব্যক্তি বিশেষে হোক। তাইতো লেখক আব্দুর রহমান বিন আব্দুল খালেকের জিজ্ঞাসা, وَهَلْ مَاتَ الْبُخَارِىُّ رَحِمَهُ اللهُ إِلاَّ مَحْسُوْدًا مَطْرُوْدًا؟ ‘ইমাম বুখারী (রহঃ) কি হিংসার শিকার ও স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রবাসে মৃত্যুবরণ করেননি’?

সম্মানিত লেখক যুগের চাহিদা ও দাবী অনুযায়ী সংগঠন বিষয়ে সৃষ্ট ধূম্রজাল দূরীকরণার্থে কুরআন ও হাদীছের আলোকে এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুস্তিকা লিখে সমাজের যে খেদমত করেছেন, মহান আল্লাহ যেন তার জাযায়ে খায়ের দান করেন। আমীন!

জনাব মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক (ঝিনাইদহ) বইটি সুন্দরভাবে অনুবাদ করে আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। বইটি হাদীছ ফাউন্ডেশন গবেষণা বিভাগ কর্তৃক পরিমার্জিত হয়েছে। বইটি সুখপাঠ্য হিসাবে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে আমাদের একান্ত বিশ্বাস।

এ বইয়ের মাধ্যমে সংগঠন করা যাবে না মর্মে সমাজে সৃষ্ট ফিৎনা দূরীভূত হ’লে আমাদের শ্রম সার্থক হবে বলে মনে করব। আল্লাহ আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাটুকু কবুল করুন এবং এর লেখক ও অনুবাদ সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে উত্তম জাযা প্রদান করুন- আমীন!